আশুধ্বসা রোগ - আলু

আলু

আশুধ্বসা রোগ

Alternaria solani


সংক্ষেপে

  • পাতার গায়ে হলুদ অস্বচ্ছ সমকেন্দ্রিক বলয়াকার বর্ধনশীল দাগ দেখা যায়.
  • পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ে.
  • কাণ্ড এবং ফলের গায়ে কালচে দাগ কম দেখা দেয়.
  • টমেটো পচতে শুরু করে এবং মাটিতে ঝরে পড়ে।.

লক্ষণ

পুরাতন পত্ররাজি, কাণ্ড এবং ফলে আশুধ্বষা রোগের লক্ষণ দেখা যায়। পাতায়, ধূসর থেকে বাদামী বর্ণের ক্ষত সমকেন্দ্রিক বৃত্তাকারে বাড়তে থাকে – যা দেখতে “চাকা চাকা দাগ” (bullseye) বলে মনে হয়। এ ক্ষতসমূহ উজ্জ্বল হলুদ রঙের অস্বচ্ছ দাগ দ্বারা বেষ্টিত থাকে। রোগ বৃদ্ধির কারনে সম্পূর্ণ পাতা ক্লোরোফিল শূন্য হয়ে ঝরে পড়ে, যা উল্লেখযোগ্যভাবে পত্রমোচন ঘটায়। একই ধরণের সমকেন্দ্রিক দাগ কালচে ক্ষত আকারে উদ্ভিদের কাণ্ড এবং ফলেও দেখা দেয়, যার ফলশ্রুতিতে কলাতন্ত্রে পচন ধরে।

ট্রিগার

অলটারনারিয়া সোলানি (Alternaria solani) ছত্রাক প্রাথমিকভাবে মাটিতে বিদ্যমান সংক্রমিত উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশের মধ্যে অথবা অন্য কোনো পরাশ্রয় দানকারী উদ্ভিদকে আশ্রয় করে শীত মরশুম অতিবাহিত করে। ক্রয়কৃত আলুবীজ আগে থেকেই সংক্রমিত থাকতে পারে। ছত্রাকটির বৃদ্ধির জন্য উচ্চ তাপমাত্রার (২০-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পাশাপাশি উচ্চ আর্দ্রতারও (৯০%) দরকার হয়। এটা সরাসরি পাতার ত্বক ভেদ করে অথবা পত্ররন্ধ্র দিয়ে উদ্ভিদের ভিতরে প্রবেশ করে। বয়স্ক গাছের নিচের পুরনো পাতা সংক্রমিত মাটির সংস্পর্শে এলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। উষ্ণ তাপমাত্রা (২৪-২৯০ সে.) এবং উচ্চ আর্দ্রতা (৯০%) ছত্রাকের বৃদ্ধির সহায়ক। এটি সরাসরি পাতার বাহিরের ত্বক ভেদ করে পত্ররন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করতে পারে। আর্দ্র আবহাওয়ায় (অথবা আর্দ্র/শুষ্ক আবহাওয়া) পাতার ক্ষত থেকে জীবানুরেণু ছড়ায়। জীবানুরেণু বায়ু, বৃষ্টির ছাঁট বা স্প্রিংলার পদ্ধতিতে সেচকার্যের মাধ্যমে ছড়ায়। এটাই স্বাভাবিক যে অতি বৃষ্টি হলে এ রোগ ব্যাপক আকার ধারন করে। গাছ সবুজ থাকতে অথবা আর্দ্র আবহাওয়াতে আলু সংগ্রহ করলে আলু ক্ষতদাগ ও সংক্রমণের প্রতি অসহনশীল হয়। অতি বৃষ্টিপাতের পর রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়, বিশেষতঃ, গ্রীষ্ম ও অব- গ্রীষ্ম মণ্ডলীয় অঞ্চলে এ প্রকোপ বেশি হয়।

জৈবিক নিয়ন্ত্রণ

ক্ষুদ্র চাষিরা শৈবাল থেকে প্রাপ্ত চুনাপাথর , ১:১ অনুপাতে চর্বিমুক্ত দুধ ও জলের মিশ্রণ অথবা চুনাপাথর গুঁড়ো আক্রান্ত গাছে ব্যবহার করতে পারেন । তাছাড়া ৪ লি জলের সাথে তিন চামচ বাইকার্বোনেট সোডা + মাছের তৈল সংগঠিত মিশ্রণও এ রোগ দমনে সহায়ক। ব্যাসিলাস সাবটিলিস সংগঠিত পদার্থ অথবা কপার সংগঠিত উপাদানও জৈব ছত্রাকনাশক হিসেবে স্বীকৃত ।

রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ

সম্ভবমত সমম্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার আওতায় জৈবিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিন। বাজারে বিভিন্ন প্রকারের ছত্রাক নাশক পাওয়া যায় যা আলুর আশুধ্বসা রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অ্যাজোক্সিট্রবিন , ডাইফেনকনাজল, বস্কালিড, পাইরাক্লোস্ট্রোবিন , ট্রাইফ্লক্সিস্ট্রবিন, ক্লোরোথ্যালোনিল, ফেনামিডোন এবং ফ্যামোক্সিডোন, ম্যানকোজেব, থাইরাম, ম্যানেব, জিরান ইত্যাদি ছত্রাকনাশক আলুর আশুধ্বসা রোগ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরণের ছত্রাকনাশক ব্যবহার করুন । উপযুক্ত আবহাওয়ায় সময়মতো সকল পরিচর্যা শেষ করুন। এ উপাদানগুলো প্রয়োগ করার পর, ফসল সংগ্রহের পূর্বে একটি বিরতি দিন যাতে স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ থাকে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

  • সুস্থ বীজ বা চারাগাছ ব্যবহার করুন.
  • সহনশীল জাত নির্বাচন করুন.
  • উঁচু বীজতলায় চারা রোপণ করুন যাতে উত্তম নিকাশী ব্যবস্থা থাকে.
  • বায়ু প্রবাহের দিক অনুসরণ করে ফসলের সারি তৈরি করুন এবং ছায়াযুক্ত স্থান যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন.
  • বৃষ্টিপাত বা জলসেচের পর পত্রপল্লব যাতে দ্রুত শুকিয়ে যায় সেজন্য চারা পাতলা করে রোপণ করুন.
  • উদ্ভিদের সাথে যেন মাটির স্পর্শ না ঘটে সেজন্য জমিতে মালচিং করুন.
  • রোগ সনাক্তকরনে ( বিশেষ করে আর্দ্র আবহাওয়াতে ) নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করুন.
  • গাছের নিচের দিকের পাতা যেগুলো মাটির খুব কাছাকাছি অবস্থায় থাকে সেগুলো অপসারন করুন.
  • স্পষ্ট লক্ষণবিশিষ্ট পাতা অপসারন করুন এবং ধ্বংস করে ফেলুন.
  • গাছ শক্ত ও সতেজ রাখতে মাটিতে পর্যাপ্ত অনুখাদ্য দিন.
  • পাতার আর্দ্রতা হ্রাসে ড্রিপ পদ্ধতিতে জলসেচ দিন.
  • গাছে সকালে সেচ দিন যাতে বিকালে পাতা শুকায়.
  • জমির ভিতরের এবং আশেপাশের অসহনশীল আগাছা নিয়ন্ত্রণ করুন.
  • গাছ ভেজা থাকা অবস্থায় আন্তঃপরিচর্যা বন্ধ রাখুন.
  • ফসল সংগ্রহের পর, উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ অপসারণ করুন এবং পুড়িয়ে ফেলুন (জৈব সার বানাবেন না).
  • ফসল তোলার পরে উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ গভীর চাষ দিয়ে মাটির সাথে মিশ্রন করুন ( ৪৫ সেমি এর গভীরে).
  • ২-৩ বছর পর পর অনাবাসী ফসল দ্বারা একটি ফসল-চক্রের পরিকল্পনা করুন.
  • পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা আছে এমন ঠাণ্ডা স্থানে আলু সংরক্ষণ করুন।.